ভাবী আমার ওড়না কই ?
- পাও নাই? আচ্ছা দেখসি আমি।
ওড়না খুঁজে ননদের হাতে দিতেই
ইফতি আমাকে ডেকে বসলো।
-তনু আমার নাস্তা দেও তাড়াতাড়ি
,আমার আগে বের হতে হবে। গাড়িতে
গ্যাস নেওয়া লাগবে।
-এইতো আর ৫ মিনিট। নিয়ে আসছি।
ইফতির নাস্তা এনে দিতেই
শ্বাশুড়ী বলল
-শুনো বৌ রান্না বাড়া শেষ হলে
ছাদে কাথা গুলা একটু শুকাতে
দিয়ে আইসো। আমরা যদি দুপুরের
খাবারের আগে না আসি তাহলে তুমি
খেয়ে নিও।
-জ্বী আম্মা আপনি চিন্তা কইরেন
না। আপনি সাবধানে যায়েন।
একটুপর সবাই চলে গেলো। বাসায়
আমি একা।
আজ আমার ননদের ঢাকা মেডিকেলে
নবীন বরণ। সবাই ঐখানেই গিয়েছে।
আহহহ!!
মোবাইলে গান ছেড়ে রান্না করার
মজাই আলাদা।
রান্না শেষে কাথা গুলা ছাদে
গিয়ে রোদে দিয়ে আসলাম। এখনো
বাসায় কেউ আসে নাই। একা খেতেও
ইচ্ছা করসে না। আমার আম্মা কে
ফোন দিলাম।
-আম্মা ভালো আছো?
- হ্যাঁ ভালো। তুই কেমন আসিস?
আর বাসার সবাই?
-এইতো আম্মা সবাই ভালো। আব্বার
শরীর টা কেমন?
-ভালোই আছে। দুপুরে খাইসিস?
-না আম্মা। ওরা কেউ আসে নাই
এখনো।
-আসে নাই মানে? কই গেসে?
- ও আম্মা তোমাকে তো বলাই হয়
নাই। ফারিয়ার এডমিশন টা হয়ে
গিয়েছে। আজ ওর নবীন বরণ। বাসার
সবাই ঐখানে গিয়েছে।
-তো তোকে নেয় নাই?
- আমি গিয়ে কি করবো? বাদ দেও
এইসব কথা। তোমার কি অবস্থাএটা
বলো।
-তনু শুন। আমি তোর মা। আমি
কিছুটা হলেও বুঝি। আমাদের ভুল
ছিলো তোকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে
দেওয়া ..
-থাক না আম্মা বাদ দেও এসব
কথা। আমি ভালো আছি। আচ্ছা
থাকো। নামাজের সময় চলে যাচ্ছে।
নামাজ পড়ে আসি। পরে কথা হবে।
এখন আল্লাহ হাফেজ।
আম্মা কিছু বলার আগেই ধুম করে
ফোন টা কেটে দিলাম।
ওযু করে নামাজ পড়ে নিলাম।
নামাজ শেষে আয়নার সামনে দাড়িয়ে
আমি।
আচ্ছা আমি কি সত্যিই ভালো আছি?
আমার বিয়েটা হয়েছিলো পারিবারিক
ভাবে। ইফতি ভালো ব্যবসা করছে।
নিজেদের বাড়ী। এক ভাই এক বোন।
ছোট পরিবার.. বাবা এমন একটা
পরিবারেই আমাকে বিয়ে দিতে
চাচ্ছিলো। যাই হোক বিয়ের আগে
আমার বাবা ইফতির মা কে
বলেসিলেন
-" আপা আমার মেয়েটা খুব
মেধাবী। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে
চাই নি। আপনারা পড়াশোনা টা
প্লিজ বন্ধ করবেন না। আমার খুব
স্বপ্ন মেয়েটাকে নিজের পায়ে
দাড়াতে দেখার।"
প্রতিউত্তরে আমার শ্বাশুড়ী
বলেসিলেন
-আমার ও মেয়ে আছে ভাই। ফারিয়া
যেমন তনুও তেমন আমার কাছে।
অবশ্যই ও পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।
আমার কোন বাধা নাই। ও যদি
সংসার সামলিয়ে চাকরি করতে পারে
সেটাতেও আমার কোন সমস্যা নাই।
আমার বাবা বেশ খুশি হয়ে গেলেন।
যাক আলহামদুলিল্লাহ ...বাবা
তার স্বপ্ন আরেকজনের হাতে তুলে
দিলেন। বিয়ের পরপর পড়াশোনা
করতে সময় পাই নি। বাসায় মেহমান
সবসময় থাকতো। হানিমুন এটা সেটা
কত কি!
অবশেষে ৩ মাস পর একটা সুযোগ
পেলাম ইফতি কে বলার
-কাল থেকে আমি ক্লাশে যাই?
-কাল থেকে যাবা? ফারিয়া আর
আম্মা কাল খালার বাসায় বেড়াতে
যাবে। বাসা খালি থাকবে।
কিছুদিন পর থেকে যাও?
মুচকি হেসে বললাম
-আচ্ছা। সমস্যা নাই।
তার কিছুদিন পর আবার বললাম।
এবার রাজীও হলো। সকাল ৮ টায়
ক্লাশ। বের হতে যাওয়ার ঠিক আগ
মুহুর্তে আমার শ্বাশুড়ী বললেন
-বৌ আমার পায়ে খুব ব্যাথা।
বুয়া আজকে আসবে না। তোমার কি
আজ খুব ইম্পোর্টেন্ট ক্লাশ?
কাল থেকে গেলে চলে?
মুচকি হেসে বললাম
-জ্বী আম্মা চলে। কাল থেকে
যাবো নে।
কয়েকদিন পর বুয়া এসেছে পরে
ক্লাশে গেলাম। নোট সাজেশন
কালেক্ট করলাম। কিন্তু পড়তে
বসলেই আমার শ্বাশুড়ী ডেকে
উঠতেন " বৌ মাথায় তেল দিয়ে
দাও"
ননদ বলত " ভাবী আমার জামা আইরন
করে দেও"
ইফতি বলত " সারাদিন পর ঘরে আসি
একটু তোমাকে পাশে বসায়া
সারাদিনের গল্প বলবো বলে আর
তুমি বই নিয়া বসে থাকো"
সবাই কে সেই মুচকি হেসে বলতাম।
"জ্বী দিচ্ছি/ হুম করছি / এইতো
এসেছি।"
বইগুলো আস্তে আস্তে দূরে যেতে
লাগলো। আর রান্না ঘরের থালা
বাসন আপন হতে লাগলো। কখনো কেউ
গর্জ করে বলে নেই " যাও আজ
শুধু পড়াশোনা করো।" আমার
পড়াশোনা করতে খুব ভালো লাগতো।
অনার্স এর রেজাল্টে প্রথম
স্থান নিয়েছিলাম আমি..
বাবা সেদিন অনেক খুশি ছিলেন।
আশ পাশের সবাইকে মিষ্টি
খাওয়াইছেন। আর আজ আমি পরীক্ষা
দিতে যাওয়ার সময় কেউ একটু বলে
না " তুমি যাও। আমরা আছি।
মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা দেও।"
বরং আমার শ্বাশুড়ী আকারে
ইঙ্গিতে বলতেন " মেয়েরা স্বামী
কে ধরে রাখতে চাইলে পড়াশোনা
চাকরি বাকরির দিক থেকে মাথার
ধ্যান ধারনা সড়াইতে হবে"
হাহাহাহাহাহাহা।
আয়নার দিক তাকিয়ে হেসে উঠলাম।
কখনো প্রতিবাদ করি নাই।
একবার বাবা ইফতি কে জিজ্ঞেস
করেসিলেন আমার পড়াটা কেন বন্ধ
করেছে ওরা?এমন তো কথা ছিলো না।
এই জন্য আমার শ্বশুর বাড়ী আগুন
লেগে গিয়েছিলো। তাদের উল্টো
কথা -
" তোমার আব্বার কাছে বিচার
দিয়েছো কেন? আমরা তোমার মুখে
চেপে রাখসি। পড়ার ইচ্ছা থাকলে
তুমি নিজে থেকেই পড়তে।"
সংসারে অশান্তি কে চায় বলেন?
চুপ হয়ে গেলাম। পরীক্ষার
ফ্রম ফিলাপ টাও করি নাই।
সবাই যখন পরীক্ষা দেয় তখন আমি
গ্রামে থেকে আসা শ্বশুরবাড়ির
আত্মীয়স্বজন কে ডাক্তার দেখাতে
হাসপাতালের বহির্বিভাগের
কাউন্টারে টিকেটের অপেক্ষায়।
এভবে আস্তে আস্তে পড়াশোনা আর
নিজ পায়ে দাড়ানোর স্বপ্ন নিজে
নিজে দাফন করলাম সংসারের মাটি
দিয়ে।
কলিং বেল বেজে উঠেছে।
কি ব্যাপার আমার চোখে পানি
কেন?
শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে
মুছতে দরজার পাশে দাড়িয়ে আমি
----
-কে?
-খোল বৌ মা। আমরা।
দরজা খুলে দিতেই ৩ টা হাসিখুশি
মুখ। হাতে গোলাপ। সবাই খুব
খুশি।
আমাকে ফারিয়া ছবি দেখাচ্ছে।
ইফতি বলল
-জানো তনু ফারিয়ার জন্য গত
পরশু একটা বিয়ের কাজ এসেছে।
আমি তো একদম মানা করে দিসি।
ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে। আমার
বোন ডাক্তার্। ব্যাঙ্কারের
সাথে যায় নাকি?
পাশ থেকে ফারিয়া বলে উঠলো
-ভাইয়া বিয়ে শাদীর কথা প্লিজ
মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। এখন আমার
সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়।
সবশেষে আমার শ্বাশুড়ী বললেন
-এখন কিসের বিয়ে শাদী? আগে
ক্যারিয়ার... এরপর কত ছেলে
পিছে ঘুরবে ...
আমি অবাক দৃষ্টিতে ৩ জনের
মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছি।
বরাবরের মত মনে মনে বলসি
" আচ্ছা আমিও তো কারো মেয়ে।
আমিও মেধাবী ছিলাম। আমিও পড়া
শেষে ভালো জায়গায় চাকরি করতে
পারতাম। আমার বাবার ও তো
স্বপ্ন ছিলো আমার নিজ পায়ে
দাড়াতে দেখার। আমাকে কেন
সংসারের দোহাই দিয়ে পড়া আটকে
দেওয়া হলো? কেন পড়তে গেলেই
বিভিন্ন কাজের অযুহাতে আমাকে
ব্যস্ত করে রাখা হতো ?
যে জায়গায় আমার ননদের পরীক্ষার
যে জায়গায় আমার ননদের পরীক্ষার
সময় আমার শ্বাশুড়ী মুখে তুলে
খাইয়ে দিতেন। আমি তো এতটাও চাই
নাই। একটু পড়তে বসার সুযোগ করে
দিলেই হতো। আমাকে কেন শুনতে হয়
চাকরী করলে স্বামী হাত ছাড়া
হয়ে যাবে ? কেন ?
কারণ আমি এ বাসার ছেলের বৌ?
কেন আমাকে বলা হতো - তুমি
চাকরি করে কি করবে? তোমাকে কোন
জিনিসে অভাবে রেখেছি। আমার
অভাবে খাওয়া কাপড়ে না। আমার
অভাব আমাকে সংসারের দোহাই দিয়ে
পড়াশোনা আটকে দেওয়ার..."
এগুলো সব আমার মনের কথা। মনের
সাথে যুদ্ধ। যার বহিঃপ্রকাশ
কখনোই হয়ত ঘটবে না।
তবে মাঝে মাঝে খুব জিজ্ঞেস
করতে ইচ্ছা করে আমার শ্বাশুড়ী
কে
" আমার পায়ে শিকল দিয়ে নিজের
মেয়ের পায়ে রকেট লাগিয়ে
উড়াচ্ছেন। নিজের মেয়ের
ব্যাপারে স্বপ্ন দেখেন তার নিজ
পায়ে দাড়ানোর…আর ছেলের বৌ কে
সংসারের দায়িত্বের ভারে কুজো
করে রেখেছেন কেন আম্মা?
কারণ আমি মেয়ে নই। ছেলের বৌ
বলে"???
মনে মনে এসব ভেবে একটু মুচকি
হেসে বলে উঠলাম
" আসেন আম্মা ফ্রেশ হয়ে খাওয়া
দাওয়া করে নেন।অনেক বেলা
হয়েছে। আমি টেবিলে খাবার
দিচ্ছি।"
আমার মনের কথাগুলা কখনোই বলা
হবে না কারণ আমি "মেয়ে" নই আমি
"ছেলের বৌ বলে।।।
সমাপ্ত
* কমেন্ট বক্সে অবশ্যই কমেন্ট করে
জানাবেন গল্পটি কেমন লাগব.....ধন্যবাদ *
সমাপ্ত
* কমেন্ট বক্সে অবশ্যই কমেন্ট করে
জানাবেন গল্পটি কেমন লাগব.....ধন্যবাদ *