গল্প : নিস্পাপ_ভালবাসা...লেখা_তন্ময়
#পর্ব_১...
আজ আমার বিয়ে। বিয়ের পিড়িতে বসে আছি। জানি না কোন ছেলে আমার মত একজন মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হল।যে আমাকে ভালবেসেছিল সে আমায় ভোগ করে চলে গেছে কিন্তু দিয়ে গেছে তার সন্তান আমার মাঝে। সুইসাইড করতে গিয়েছিলাম কিন্তু পারি নি। বাচ্চাটাকেও নস্ট করতে পারি নাই।নিজের পাপের শাস্তি একটা নিস্পাপ প্রানকে দেয়ার মত পাপ কাজ করার সাধ্য আমার মাঝে নেই।বান্ধুবিরা খুব সুন্দর করে আমায় সাজিয়ে দিতেছে। কিন্তু আমার মনে আজ কোন খুশি নেই। সিয়ামের দেওয়া প্রতারনা আমায় কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।ছেলেরা হয়ত এমনই।
ভালবাসার নাম করে আগে ভোগ করে আর তারপর মোড়ানো কাগজের মত ছুড়ে ফেলে দেয়। যে আমায় বিয়ে করতে রাজি হয়েছে তার সামনে আমি মুখ কি করে দেখাব। আমি যে কলঙ্কিনি।অনেক বার বাবাকে বারন করেছি কিন্তু সে তার মান সম্মানের কারনে আমায় বিয়ে দিতেছে তার ছোট বেলার বন্ধুর সাথে। কিছু সময় পর বাবা আস্লো...
-তিশা মা চল...বর পক্ষ এসে গেছে...
-চলো বাবা..(চোখ মুছে বললাম)..
এখন আমাকে বিয়ের পিড়িতে নেয়া হচ্ছে।সবার নজর আমার পেটের দিকে। আর থাকবেই বা না কেন বিয়ের আগেই যে মেয়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্বা তার দিকেই এইভাবেই তাকানো দরকার। কয়েকজন তো বলেই দিল...
-দেখ দেখ মেয়েটার কি ভাগ্য পেটে বাচ্চা নিয়ে বিয়ে করছে...
তাদের কথাগুলো সুচের মত মনে হয় আমার কাছে। কিন্তু করার কিছুই নেই যেই ভুল করেছি তার ফল ভোগ করতেই হবে....
।
এখন আমি আমার স্বামীর পাশে বসে আছি। দেখেই বুঝা যায় পরিবারের চাপে আমার মত একটা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। ওনার চোখ দুইটা ফুলে লাল হয়ে গেছে। জানি না কিসের কারনে কান্না করেছে। ছোট বেলা থেকেই শুনে এসেছি ছেলেরা কাদতে জানে না কিন্তু এনাকে দেখে বিপরিত মনে হয়েছে। সাইজে অনেক লম্বা আর খুব মায়াভরা মুখ তার। মুখে ছোট ছোট দাড়ি তার সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আজ আমার পাশে সিয়ামের বসার কথা ছিল কিন্তু আজ ও নেই। কেন জানি এই লোকটার প্রতি আমার সাম্মান বেড়ে গেছে আমার মত একজনকে বিয়ে করার কারনে.....
।
কিছুসময় আগে বিয়ে হয়েছে। শশুড় বাড়িতে চলে এসেছি। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি আমার স্বামি এখনো একবারের জন্য আমার দিকে তাকায় নাই। বাসায় এসে কাউকে কিছু না বলেই বাইক নিয়ে কোথাও বেরিয়ে গেল। ওনার চোখ দিয়ে তখনো জল পড়ছিল।কিছু একটা চাপা কস্ট তাকে কুড়ে খায়। হয়ত আমায় বিয়ে করার কারনে। শাশুড়ি মা তাকে আটকানোর অনেক চেস্টা করেছে কিন্তু পারে নি। আমাকে বরন করে শাশুড়ি মা রুমে নিয়ে গেল।কেন জানি আমার মনে হচ্ছে আমি আমার মাকে ফিরে পেয়েছি। সব কিছু জেনেও উনি আমার সাথে একজন মায়ের মত ব্যাবহার করছে। আমাকে বিছানায় বসিয়ে উনি কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাক্লেন। কিছু না বলে আমাকে চুমু দিলেন। আমি কিছু না ভেবে তাকে জড়িয়ে কাদতে লাগলাম। সে আমার মাথায় হাতত বুলিয়ে দিতে লাগল...
-কাদিস না মা...আমি তো আছি তোর কিছু আমি হতে দিব না।আমি জানি তোর মনের অবস্থা। এখন অতিতের ভুল নিয়ে থাকলে চলবে না। সামনে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা করতে হবে...
-বিশ্বাস করুন আমি আপনার ছেলেকে ঠকাতে চাই নাই।বাবা আমাকে জোড় করে বিয়ে দিছে...
-ওগুলো চিন্তা করিস না আজ থেকে তুই আমার মেয়ে...
আমার সব কিছু সপ্নের মত লাগছে। এত ভাল একজন মাকে পাবো কোনদিন ভাবি নি। নিজের মা বেচে থাকলে হয়ত আমাকে দেখতে পারত না এই অবস্তায় কিন্তু এন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে শান্তনা দিতেছে।আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম...
-মা উনি কোথায় গেল বেরিয়ে....
-নিজের কস্ট লুকাতে গেছে হয়ত...(বলেই চোখ মুছলেন)
-কি হয়েছে ওনার..
-থাক মা পরে কোন দিন বলবো..
আমার সাথে কিছু কথা বলে মা চলে গেল। আমি বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগ্লাম। রাত দুইটা বারোটা বেযে গেছে কিন্তু উনি আস্লেন না। কিছু সময় পর চিল্লাচিল্লির আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে গেল।উনার কথা শুনে বুঝাই যায় উনি মদ খেয়ে এসেছে। এমন মায়া ভরা একজন ছেলে মদ খেতে পারে আমার মেনে নিতে কস্ট হচ্ছে....
।
।
কিছুসময় পর উনি রুমে আসলো। আমার খুব ভয় করছে। সমস্ত শরির ঘামছে। যদি এই অবস্তায় উনি আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে।বিছানা থেকে নামতে যাব এমন সময়...
-ওই তুই একদম আমার কাছে আসবি না...তোর কারনে আমার জিবন ছারখাড় হয়ে গেছে...
-আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই নাই..(কাদো কাদো কন্ঠে)
-চুপ একদম চুপ থাক তুই...দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে...
উনি ভেল্কেনির দিকে চলে গেল। আমি বিছানার এক কোনে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকলাম। পেটে হাত রেখে আমার সন্তানের সাথে কথা বলতে লাগ্লাম....
।
কারো কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। আমি ঊঠে গিয়ে দেখি আমার স্বামী কান্না করছে। সে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। চিতকার করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে...
-I love you...I miss you..please come back in my life..
#পর্ব_২...
উনার কথাগুলি শুনে আমার কৌতুহল বেড়ে গেল। কি হয়েছে উনার। ইচ্ছা করছে উনার কাধে হাত রেখে শান্তনা দেই কিন্তু উনার সামনে যেতেই খুব ভয় করছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। কিছুসময় পর উনি পিছনে ঘুরলেন আমাকে দেখে রেগে গেলেন...
-তুই এখানে কি করিস...তোকে না বলেছি আমার সামনে না আসতে...
-না আসলে আপনি কাদছিলেন তাই...(আমতা আমতা করে)
-আমি কাদি না হলে হাসি তাতে তোর কি..তুই তো একটা চরিত্রহিনা আর নস্টা মেয়ে। অন্যের পাপের ফসল আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিস....
উনার কথাগুলো শুনে কান্না চলে আসছে। উনিই বা কি করবে আমার মত একজন মেয়েকে কোন ছেলেই বা বিয়ে করতে চাবে। উনি এইবার শান্ত গলায় বললেন...
-আচ্ছা আমার ভালবাসা তো পবিত্র ছিল কিন্তু ও আমাকে ছেড়ে গেল কেন বলতে পারেন....
-কি হয়েছিল আপনার ভালবাসার...
-তা আমি বলবো না আপনাকে কিন্তু ও আমার থেকে দূরে চলে গেছে শুধুই আপনার কারনে....
-আমাকে বলুন সে কোথায় আমি নিজে তাকে ফিরিয়ে আনবো...
উনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বললেন...
-আমার শোভা আমাকে ছেড়ে ওই আকাশে চলে গেছে...
উনার কথা শুনে খুব খারাপ লাগলো। কিন্তু এখানে আমার কি দোষ তা বুঝলাম না আমি। উনি আরো বলা শুরু করলেন...
-আপনার কারনে আমার শোভা আমায় ছেড়ে চলে গেছে আমি আপনার কাছ থেকে আপনার বাচ্চা কেড়ে পাঠিয়ে দিব আমার শোভার কাছে....(মুখে পৈশাচিক হাসি)
আমি ওনার কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। কিছু সময় আগের সেই শান্ত রুপ এখন দজ্জালের রুপ ধারন করছে। আমি উনার পা আকড়ে ধরলাম....
-প্লিজ আমার এত বড় ক্ষতি করবেন না...এই সন্তানের কারনেই আমি এই সমাজের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছি...
উনি কিছু না বলে আমাকে এক লাত্তি মেরে চলে গেল। আমি গিয়ে সোজা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেলাম। কপাল ফেটে রক্ত পড়তে থাকল। কিছুসময় বসে থেকে রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি উনি সোফায় ঘুমিয়ে গেছে। আমার কপাল খুব বেথা করছে।বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার খুব ভয় করছে যদি উনি আমার সন্তানকে মেরে ফেলে। না না উনি করবে না?আমি করতে দিব না....
।
মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম উনি আমার কেটে যাওয়া কপালে ঔষধ লাগিয়ে দিতেছে। আমি উনার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলাম। উনি বলল...
-জানেন আমার শোভা বলেছিল নারিদের সব সময় সম্মান করবে...
-কি হয়েছিল আপনার শোভার...
বিছানে থেকে উঠতে পারছিলাম না। পেটে ব্যাথা করছিল। উনি আমাকে ধরে বিছানায় হেলান দেওয়া অবস্থায় বসিয়ে দিলেন। আমি ওনাকে দেখে অবাক হচ্ছি....
-ওর ব্রেইন টিউমার ছিল...টাকার কারনে বাচাতে পারি নাই...(চোখ দিয়ে পানি পড়ল তোর)..
আমি ওনার কথা শুনে খুব অবাক হলাম। যার বাবার এত টাকা আর তার ভালবাসাকে নাকি টাকার কারনে বাচাতে পারে নি...
-আপনার তো অনেক টাকা তবুও...
-আমার কোন টাকা নেই... সব ওই আজিজের(আমার শশুড়)টাকা। আমার কিছুই নেই...
-বাবা আপনাকে টাকা দেয় নি কেন...
-আপনার কারনে..আর এখন কথা না বলে ঘুমিয়ে পড়েন....
উনি উঠে চলে গেলেন। কিন্তু আমার দোষ কই কিছুই বুঝতে পারলাম না...
।
সকালে ঘুম থেকে উঠে উনার দিকে নজর গেল।সোফা থেকে পড়ে ফ্লোরে ঘুমিয়ে আছে। কি মায়াবি চেহারা তার। আমি ফ্রেশ হয়ে মায়ের কাছে গেলাম। বাবা পেপার পড়ছে। আমাকে দেখেই মা রেগে গেল...
-ওই বদ মেয়ে তুই এই অবস্থায় রান্না ঘরে আসছিস কেন...যা গিয়ে বিশ্রাম কর....
-থাক না মা থাকি না তোমার কাছে..ভাল লাগে আমার...
-পাগ্লি মেয়ে যা চেয়ার নিয়ে এসে বস...
-আচ্ছা মা...
।
।
কিছুসময় পর আমরা নাস্তা করতে বস্লালাম। কিন্তু উনি আসলেন না। মা আমাকে খাইয়ে দিতে লাগল। শশুড় আব্বু উঠে যাওয়ার পর উনি এসে নাস্তা করে উঠে চলে গেলেন...
-মা একটা কথা বলি...
-হুম বল..
-উনার সাথে আব্বুর কি হয়েছে...
-বাবাকে ভুল বুঝেছে আমার ছেলেটা...
-ভুল ভাঙবে না রে মা ও যে ওর জিবনের সবচেয়ে বড় জিনিসটাকেই হারিয়ে ফেলেছে...
-শোভা আপুর কথা বলছেন....
-হুম রে মা...
।
।
শোভার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তন্ময়। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। শোভার সাথে কথা বলছে তন্ময়..
-জানো শোভা যে তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছে তাকে আমি বিয়ে করেছি শুধু তোমার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার কারনে। আমার এখন দুইজন শত্রু একজন আমার বাবা আজিজ আর একজন ওই তিশা।এদের আমি আরো কস্ট দিয়ে মারবো যতটা কস্ট তুমি পেয়েছ।এদের আমি মারবো না কিন্তু তিলে তিলে কস্ট দিয়ে এদের মনকে মেরে ফেলবে। তুমি একদম চিন্তা করো না...
সারাদিন শোভার কবরে মাথা রেখে শুয়ে থাকে তন্ময়। চোখের জলে শোভার কবরের মাটি ভিজে যাচ্ছে..
-এই পাগ্লি মেয়ে তুমি উঠে আসছো না কেন..তোমার না অন্ধকার খুব ভয় লাগে। তাহলে কিভাবে আছো এই অন্ধকার ঘরে...প্লিজ উঠে আসো....
রাত হয়ে যায় কিন্তু তন্ময় এর শোভাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না। যাবেই বা কি করে কবরে যে তার স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। হুম তারা চুপিচুপি বিয়ে করেছিল।কেউ জানত না হয়ত আজিজ সাহেব মেনে নিত না। মৃত্যুর আগে শোভার গর্ভে ছিল পাচ মাসের সন্তান। তার বাবা যদি তাকে টাকাটা দিত তাহলে আজ হয়ত তার স্ত্রি সন্তান বেচে থাকত। তিশার কারনে যেমন ওর বুক খালি হয়েছে তাই তন্ময় ঠিক করেছে তিশার কোল খালি করে দিবে ও....
।
।
সেই সকালে উনি বের হয়েছে কিন্তু এখনো আসে নি। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে ওর কারনে। কিছু সময় পর উনি আসলেন...
-কোথায় ছিলেন আপনি...
-তা তোকে বলতে হবে নাকি..(বলেই ধাক্কা দিল)
উনি ফ্রেশ হতে চলে গেলেন। যেভাবেই হোক আমায় জানতে হবে শোভার চলে যাওয়ায় আমার কি দোষ...
#পর্ব_৩..
উনি ফ্রেশ হতে চলে গেলেন। আমি বসে বসে চিন্তা করছি আমি কি এমন করেছি যার কারনে উনি আমাকে অপরাধি মনে করছে।এমন সময় ব্যাথায় কাকিয়ে উঠলাম। আমার পেটের দুস্টুটা লাত্থি দিয়েছে। কিছুসময় পর উনি ফ্রেশ হয়ে এসে বসলেন। আমি ওনার সামনে গিয়ে দাড়ালাম...
-আপনার সাথে কিছু কথা ছিল...
-জি বলেন..
-শোভা আপুর মৃতু্্যর সাথে আমার সম্পর্ক কি..
আমার কথাগুলো শুনে উনি ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারলো আমাকে। তার পর বললেন...
-তুই একমাত্র তোর কারনে ওই আজিজ আমায় টাকা দেয় নি। তোর মত একজন মেয়েকে বিয়ে করবো না বলে আমায় টাকা দেই নি। সেইদিন যদি এক ঘন্টা আগেও টাকা জমা করাতে পারতাম তবে আমার শোভা আমার কাছেই থাকত। আমি শুধু শোভাকেই হারাই নি হারিয়েছি আমার সন্তানকেও....
-আপ্নারা বিয়ে করেছিলেন..(আমি)
-হুম..আমাদের বিয়ে হয়েছিল...
-তাহলে বাসায় জানান নাই কেন?
-আজিজ মেনে নিত না তাই...আর তোর মুখে আমি আমার শোভার কথা শুনতে চাই না।আরেক বার যদি তুই ওর কথা মুখে আনছিস তাহলে তোর জিভ আমি টেনে ছিড়ে দিব....
কথাগুলি বলে উনি চলে গেলেন। আমি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইলাম.।আমার কারনে আজ উনি সব কিছু হারিয়েছেন। আর আমি কি না ওনার সাথেই সংসার সাজানোর সপ্ন দেখছি...ছিইই..নিজের প্রতি নিজের ঘৃনা লাগছে এখন আমার...
।
।
-বাবা আসবো..
-আয় মা ঘরে আয়..(শশুড় আব্বু)
-বাবা একটা কথা ছিল...
-হুম বল..
-আপনি কেন উনার জিবন্টাকে শেষ করে দিলেন..কেন শোভা আপুকে বাচালেন না...
-ওইসব কথা বাদ দে.. আর আমি বলতে পারবো না..
-কেন পারবেন না বলতে আপনাকে বলতেই হবে কেন আপনি সামর্থ থাকার পরেও শোভা আপুকে বাচালেন না...
-আরেক দিন বলবো.. আজ নয়।গিয়ে বিশ্রাম নে। আর শোভাকে আমি বাচাতে পারতাম কিন্তু ভাগ্যর কারনে অপরাগ ছিলাম তখন...
।
দিনগুলি ভালভাবেই কেটে যাচ্ছিল।মা বাবা আমার খুব যত্ন নেয়। কিন্তু উনি আমার দিকে মুখ ফিরেও তাকায় না। আমিও কিছু বলি না। উনি ওনার মত থাকে আর আমি আমার মত। একদিন আমার মোবাইলে কল আসে...
-আস সালামুআলাইকুম...
-কেমন আছো জানু..শুনলাম তোমার নাকি অনেক ভাল জায়গায় বিয়ে হয়েছে...
-কে আপনি?আর এমন বাজেভাবে কথা বলছেন কেন...
-যার সাথে এক বিছানায় আসলে আর তাকে চিনতে পারছো না বুঝি....
-সিয়াম তুমি..
-এইত চিনছো তবে...
-কেন ফোন দিয়েছ তুমি ?
-বাহ রে আমার বাচ্চার মায়ের খবর বুঝি আমি নিতে পারি না...
-জাস্ট শাট আপ..কে তোর বাচ্চার মা..জিবনে সবচেয়ে বড় ভুল করেছি তোর মত একজন ইতরের বাচ্চাকে ভালবেসে...
-আহ জান শোন না কাল চুপচাপ আমার সাথে দেখা করতে চলে এসো..না হলে তুমি তো জানোই আমি কি করতে পারি...
-তুই আর কি করবি রে...যা করার তা তো করেই ফেলেছিস। আর ফোন দিবি না..টুট টুট..
ফোনটা কেটে ওর নাম্বার ব্লাকলিস্টে রাখলাম। আজ খুব কান্না করতে ইচ্ছা করছে। কাকে জিবনের থেকে বেশি ভালবাস্লাম যে কিনা আমার জিবনকে পুড়িয়ে দিয়ে চলে গেল...
.
পিছনে ঘুরতেই দেখি উনি দাঁড়িয়ে আছে।ওনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক প্রকার ভয় পেয়ে গেলাম। ওনার চোখে রাগ প্রকট আকার ধারন করেছে...
-কার সাথে কথা বলছিলি তোর প্রেমিকের সাথে বুঝি....
-বিশ্বাস করুন যদি জানতাম ও ফোন দিয়েছে তাহলে কখনো ধরতাম না...
-তোর মত মেয়েকে আমি ভাল করেই চিনি..তোর মত কিছু কলঙ্কিনির কারনে নারি জাতিকে অপমানিত হতে হয়..(চুলের মুঠি ধরে)...
-হুম আমি কলঙ্কিনি। আমার কারনে তো আপনার জিবনে শান্তি নেই। আমাকে মেরে ফেলছেন কেন...(কেদে কেদে)
-তোকে তো আমি এম্নিতেই মারবো না..আমার শোভা যত কস্ট পেয়ে মরেছে তার চেয়ে হাজার গুন কস্ট দিব তোকে। তোকে বুঝাব যখন সন্তান মারা যায় তখন কেমন লাগে।তোকে আমি একটু একটু করে মারবো....
রুম থেকে চলে গেল কথাগুলি বলে...
কয়েকদিন পরে পেটে খুব ব্যাথা উঠলো। আমাকে মেডিকেলে নিয়ে আসা হলো। উনিও এসেছেন সাথে। অপারেশন থিয়েটারে ঢুকানোর আগে পর্যন্ত ওনার হাত শক্ত করে ধরে ছিলাম। কেন জানি উনি কিছু বলে নাই। ওনার চোখে পানি দেখেছিলাম মনে হয় শোভা আপুর কথা মনে পড়েছিল...
-আমার কিছু হয়ে গেলে প্লিজ আমার বাচ্চাটাকে দেখিয়েন প্লিজজ...
উনি কোন কথা বলে নি।
।
কিছু সময় পর নার্স আমার কোলে একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান দিয়ে গেল। দেখতে খুব মায়াবি হয়েছে।মা এসে ওকে কোলে তুলে নিল। আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম...
-মা উনি কোথায়...
-কে যেন ফোন দিয়েছিল তাই চলে গেছে...
-মা উনি যে আমায় বলেছিল আমার কোল থেকে আমার সন্তান কেড়ে নিবে....
-ও যতই বলুক বাচ্চাদের ও অনেক ভালবাসে...
।
সেইদিন মেডিকেলে থাকতে হল। মেয়েকে পাশে রেখে দেখতে লাগলাম। কি সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে। কখন যে চোখ লেগে গেল বুঝতে পারলাম না। ভোরে আমার কেবিনে কে যে ঢুকে পড়ল...
-কে কে ওখানে...
-আমায় চিনতে পারছো না বুঝি জানু...
-সিয়াম তুমি?(ভয় লেগে গেল)
-আমার সন্তান কে দেখতে এলাম...
-চলে যা তুই এখান থেকে...
সিয়াম কিছু না বলে এক হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরল আর এক হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরল..
-আজ তোকে তোর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিব..
#শেষ পর্ব
সিয়াম কিছু না বলে আমার গলা চেপে ধরল। আমি ছাড়াতে চেস্টা করেও ওর সাথে পেরে উঠতে পারছিলাম না। আমার নিঃশ্বাস কমে আসছিল। এমন সময় পেছন থেকে কেউ এসে সিয়ামের কলার ধরে ওকে মারতে থাকল। আমি দেখে অবাক হলাম আমার স্বামী আমাকে রক্ষা করছে। সিয়ামকে ইচ্ছামমতো মারতে থাকল উনি...
-তুই আমার বউকে মারবি...তোর এত বড় সাহস..
এই প্রথম আমি ওনার মুখে বউ কথা শুনলাম। কিযে ভাল লাগছিল বলে বোঝাতে পারছিলাম না। সিয়ামকে উনি পুলিশের কাছে তুলে দিল। উনি আমার সামনে এসে বললল...
-আপ্নি ঠিক আছেন তো..
-মাথা নাড়ালাম..
-ওর কাছ থেকে আমি আপনাকে বাচালাম এই কারনে যে আপনাকে মারবো আমি...(হেলার ছলে)
।
পিচ্চিকে নিয়ে আজকে বাসায় এসেছি।বাসার সবাই খুশি কিন্তু উনাকে দেখলাম না। আমি ঠিক করেছি আমারর মেয়ের নাম শোভা রাখবো ইনি যাই বলুক না কেন। ছাদে গিয়ে দেখি উনি একমনে সিগারেট টানছে...
-আপ্নি কেন নিজেকে এইভাবে শেষ করে দিচ্ছেন...
-আমার লাইফে আমি অন্য কারো ইন্টারফেয়ার পছন্দ করি না...
-আমি আপনার স্ত্রী আর আমার স্বামীর ক্ষতি হোক আমি চাই না...
-ওই কে তোর স্বামী..তোকে আমি বউ হিসেবে মানি না..
কথাগুলি বলে সিগারেট ফেলে দিয়ে উনি চলে গেল। আমি ওনাকে স্বাভাবিক জিবনে ফিরিয়ে আনবোই..
।
শোভার বয়স এখন তিন মাস। খুব মিস্টি দেখতে হয়েছে ও। কিন্তু উনি এখনও ওকে কোলে তুলে নেয় নি। নিবেই বা কেন শোভা তো আর নিজের সন্তান না। আমি ঘরে বসে শোভার সাথে খেলছিলাম। উনি রাগি লুক নিয়ে শোভাকে কোলে তুলে নিল..
-আজ আমার সন্তান বেচে থাকলে ওর এক বছর হত। কিন্তু তোদের কারনে বাচাতে পারি নি। আজ তোর সন্তানকে নিজ হাতে খুন করবো...
ওনার কথাশুনে ভয়ে আমার শরির ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি বারবার আমার মেয়েকে উনার কাছ থেকে নিতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না। আমাদের ধস্তাধস্তিতে শোভা কান্না করছিল। কিন্তু উনি পৈশাচিক হাসি দিচ্ছিলল..
-প্লিজ আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন..আমার মেয়েকে আমার কাছে কেড়ে নিবেন না...(কেদে কেদে)
উনি শোভাকে আমার কোলে তুলে দিল। তারপর বলতে লাগল..
-দেখেন আমি শুধু আপনার মেয়েকে নিয়ে একটু ভয় দেখালাম তাতেই এই অবস্থা কিন্তু আমি তো আমার স্ত্রী সন্তান দুটোই হারিয়েছি...(কথাগুলো বলার সময় উনার চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছিলো)
কেন জানি উনার চোখের পানি আমি সহ্য করতে পারি না। উনাকে যে আমি অনেক ভালবেসে ফেলেছি..
-শোভা আপু চলে গেছে আমাদের কারনে এটা আপনার ভুল ধারনা..যার চলে যাওয়ার সে চলে যাবে...
উনি কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল...
।
।
আমার পিচ্চিটা তিন বছরের হয়ে গেছে। গুটি গুটি পায়ে সারা বাসা মাতিয়ে রাখে। সবার চোখের মনি হয়েছে। ও খালি ওর বাবার কাছে যেতে চায় কিন্তু উনি যতদুর পারে ওকে দূরে সরিয়ে রাখে। ওর দাদু ওকে একটা বিড়াল এনে দিয়েছে। ভাল করে কথা বলতে না পারায় ওকে বলে কিত্তু...।অনেক কিউট দেখতে আমার মাম্মামটা। সব সময় ওর বায়না রেডি থাকে। আমার বিশ্বাস একদিন উনি আমাদের মেনে নিবে....
।
রান্নাঘরে নাস্তা বানাচ্ছিলাম।আজ উনি অফিসে যায় নাই। বাবা মা গেছে হজে। আমি খেয়াল করলাম শোভা উনার রুমে গেল কিন্তু ওতটা খেয়াল করলাম না।কিন্তু পরসময়ে দৌড়ে গেলাম ওকে আনতে। কারন উনি কি করে তার ঠিক নেই। গিয়ে দেখি আমার পিচ্চি মেকাপের সামগ্রি দিয়ে ওনার বুকের উপর উঠে সাজাচ্ছে ওনাকে। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম দেখতে কি হয় আজ....
।
উনি ঘুম থেকে ঊঠে ওকে দেখে রেগে গেল। ও বাবাইকে দেখে একটা মিস্টি হাসি দিল। উনার রাগি চেহারা একজন স্নেহময়ি বাবার মত হয়ে গেল। শোভার মুখে চুমু দিতে দিতে কেদে দিল। আমার পাক্নি বুড়িটা ওনার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলছে...
-পপ্পাহ তুনি কাদচো কেন...
-কই মামুনি আমি কোথায় কাদছি..
-আমাল পাপ্পাহ কাদলে আমাল কস্ত হয় তুনি জানো না...
-আর কাদবো না মা...
শোভা কিছু না বলে ওনার বুকের উপর ঘুমিয়ে গেল। ওনার মাঝে এত স্নেহভরা আজ বুঝতে পারলাম। উনি আমাদের মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। আমি খেয়াল করলাম আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে.....
।
।
রাতে গিয়ে দেখি উনি বিছানায় ঘুমিয়ে আছে।উনি প্রতিদিন সোফায় ঘুমায়। আমি বালিশ নিয়ে সোফায় আসবো সেই উনি আমার হাত টান দিয়ে ওনার বুকে জড়িয়ে ধরল আমাকে। এই প্রথম উনি আমায় স্পর্শ করল। আমি ওনার বুকে হুহু করে কেদে দিলাম....
-আই এম সরি তিশা...আমায় মাফ করে দাও...
আমি কিছু বলতে পারছি না কান্নার কারনে। ওনাকে শক্ত করব জড়িয়ে ধরে আছি।উনি আমার কপালে চুমু দিল...
-আজ আমাদের মেয়ের মাঝে আমি শোভাকে দেখতে পেয়েছিলাম।তারপর নিজের ভুল বুঝতে পারলাম।আমি সরি...
-আপ্নি চুপ করে থাকেন। কতদিন পর আপনাকে পেলাম....
উনি আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল...
-এখনো আপনি করে বলবেন...
-না তুমি....
উনি আমাকে ওনার ভালবাসায় আবদ্ধ করলেন। নিজের স্বামীর ভালবাসা আজ পেলাম। আমার পবিত্র ভালবাসা। উনি আমাকে বললেন...
-আমায় ভালবাসবে আমার শোভার মত...
-হুম ভালবাসবো খুব..(বলে দুই ঠোট মিলিয়ে দিলাম ওনার মাঝে)...
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি ওনার বুকে ঘুমিয়ে আছি। খুব লজ্জা লাগছিল তখন। আমি ওনার বুকে আবারো ঘুমিয়ে পড়লাম...
।
এখন আমি অনেক সুখি। আমার বর অনেক ভালবাসে আমায়। উনি ঠিকি বলেছিল উনি আমার সন্তানকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে। আমার পাক্নি বুড়িটা ওনাকে বেশি ভালবাসে। উনি যা বলে তাই করে। এখন আমার মাঝে ওনার ভালবাসা বেড়ে উঠছে। মাঝে মাঝে আমাদের ঝগড়া হয়।উনি বলে শোভাকে উনি বেশি
ভালবাসবে আর এই সন্তানকে কম। আমিও কম কিসের আমিও বলি আমার দুই সন্তানকে ভালবাসতে হবে ওনাকে। আমি তো জানি উনি দুইজনকেই বেশি ভালবাসবে। উনি আর আমার পাক্নি বুড়ি একটু পর পর এসে আমার পেটে মাথা রাখে। আমার খুব ভাল লাগে.....
।
আজ দ্বীতিয়বারের মত মা হয়েছি কিন্তু আমাদের সন্তানকে আমরা বাচাতে পারি নাই। কিন্তু আজ দেখেছি উনি আমায় কত ভালবাসে। উনি কেবিনে এসে আমার হাত ধরল..
-আমি সরি ওকে বাচাতে পারলাম না...
উনি আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল...
-এই পাগলি তুমি থাকলেই হবে আর আমাদের মামুনি আছেই তো। আমাদের মামুনিকে আমরা আমাদের মনের মত মানুষ করবো...
।
খুব ভাল লাগে ওনাকে। ওনার ভালবাসা একেবারে নিস্পাপ। এই ভালবাসায় কোন অপবিত্রতা নেই। খুব ভালবাসি আমার বাবু আর বাবুর আব্বুটাকে...
সমাপ্ত..
* কমেন্ট বক্সে অবশ্যই কমেন্ট করে
জানাবেন গল্পটি কেমন লাগব.....ধন্যবাদ *